স্বাধীন মিডিয়ায় পরাধীনতার প্রশ্ন কেন?
আমার ৪৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আমি মার্শাল ল দেখেছি, জরুরি অবস্থা দেখেছি, রাজনৈতিক সরকার দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেখেছি কিন্তু যেটা দেখিনি সেটা হলো- দেশের নেতা-নেত্রী, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির দায়ে কারাগারে। যেটা দেখিনি, জরুরি অবস্থার মধ্যেও প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ শেষ হতে না হতেই সব মহল থেকে নেগেটিভ-পজেটিভ বক্তব্য দিচ্ছে, পত্রিকার পাতা থেকে টিভি পর্দায় তা সব অবলীলায় প্রচার ও প্রকাশ হচ্ছে। রাতের বেলা যদি টিভি পর্দার সামনে বসা যায়, তাহলে দেখা যাবে বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পরিচয়ের কেতাদুরস্ত ব্যক্তিরা মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন সরকারের নানাবিধ কর্মকা- সম্পর্কে। সরকার এটা করেনি, ওটা করেনি, এটা করা উচিত ছিল, ওটা করা উচিত ছিল, এই ব্যর্থতা, সেই ব্যর্থতা ইত্যাদি ইত্যাদি। সকালবেলা পত্রিকা খুললে দেখা যায় কতো শত মন্তব্য। যে যেভাবে পারছেন বলে যাচ্ছেন। এমনকি দায়িত্বশীল পদে কর্মরত অবস্থায়ও অনেকে সরকারের ভালো নিয়ে বলছেন, মন্দ নিয়ে বলছেন।
আমি অবাক হই, আমি বিস্মিত হই, মাঝে মধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করি- দেশে না জরুরি অবস্থা? তাহলে এ ভাষায় এসব কথা এরা বলছেন কেমন করে? যারা বলেন তারা অনেকে হয়তো যখন-তখন বিদেশে যাতায়াত করেন, কিন্তু দেশের সামগ্রিক খোঁজও নেন না। পেছনে ফেলে আসা দীর্ঘ সময়ের হিসাব নিতে গেলে হয়তো দেখা যাবে দেশ ও মানুষের কল্যাণে সামান্যতম অবদানও রাখেননি। কিন্তু তারা বলেন, নিয়মিত বলেন, টিভি ক্যামেরার সামনে বিজ্ঞ ব্যক্তির মতোই বলেন। যারা সঞ্চালকের ভূমিকায় থাকেন তাদের অতীত অনেক রকম ইঙ্গিত দেয় তারপরও বলবো- তারা নিয়মিত অনুষ্ঠান করে চলেছেন, যেসব অনুষ্ঠান নিয়ে অপ্রস্তুত হওয়ার সুযোগ আছে। অপ্রস্তুত হওয়ার কারণ আছে। কিন্তু দেখা যায়, স্বাধীনভাবে তারা অনুষ্ঠান করছেন। টক শো-এর সঙ্গে অনেক টক ঝাল মিষ্টি কথা বলে ফেলছেন- যা সময়ের সঙ্গে যায় না। জরুরি অবস্থার মধ্যে তো নয়ই। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা। সরকার, সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা এবং সেনাবাহিনী নিয়ে কটাক্ষ করার সুযোগ পেলে কেন যেন কেউ সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। একটি পরিচিত দৈনিকের সহযোগী প্রকাশনা হিসেবে প্রকাশ হওয়া একটি সাপ্তাহিকে অশ্লীল মন্তব্য পর্যন্ত করা হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আলুর দোষ রয়েছে এমন মন্তব্য করে একজন মহিলা সাংবাদিক বর্তমান সময়ে আলুর চাহিদা, আলুর প্রয়োজনীয়তা এবং আলু বিষয়ক আন্দোলনকে কটাক্ষ করেছেন। একই অবস্থা দেখা গেল, দেশের দুটি দৈনিকের সম্পাদক তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধার প্রয়োজনে সব সম্পাদককে নিয়ে বিশেষ বাহিনীকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশেষ বাহিনী কিংবা সম্পাদক মহোদয় কাউকেই ছোট করে না দেখে, কারো প্রতিই আমি আমার অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করে শুধু পাঠকদের সামনে কয়েকটি প্রশ্ন তুলে ধরছি।
১. দেশের পত্র-পত্রিকায় আপনারা যেসব সংবাদ পাঠ করছেন তাতে কি কোনোভাবে মনে হয় সংবাদপত্রে স্বাধীনতার কমতি আছে?
২. টিভি চ্যানেলগুলোতে খবর এবং টক শো-এর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত যা কিছু প্রচার হয়ে আসছে তাতে কি কোনোভাবে মনে হচ্ছে এদের স্বাধীনতায় কোনো ঘাটতি আছে?
৩. একুশে টিভি, চ্যানেল আই, এনটিভি, বাংলাভিশন, এটিএন বাংলাসহ অন্যান্য সবকটা চ্যানেলে প্রতিদিন যেভাবে খবর ও টক শো প্রচার হচ্ছে তাতে কখনো কি মনে হয় দেশে জরুরি অবস্থা আছে?
আমরা তো জানি, জরুরি অবস্থা মানেই অনেক বিধিনিষেধ, অনেক নিয়মকানুনের মধ্যে লাগাম টেনে চলতে হয়, বলতে হয়।
আমি জানি না, আমার এ বক্তব্যে পাঠক অসন্তুষ্ট হবেন কি না, বিভিন্ন পত্রিকার মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিকরা অসন্তুষ্ট হবেন কি না, তবে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা যেমন বিশ্ববাসীর কাছে বলে এসেছেন আমাদের মিডিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন। আমি তাঁর কথায়, তাঁর আন্তরিকতায় যেমন ঘাটতি খুঁজে পাইনি, তেমনি মিডিয়ার স্বাধীনতায় তেমন কোনো ঘাটতি দেখিনি। বিশেষ বিশেষ পত্রিকা যেভাবে উদার, মুক্ত ও সাহসী সংবাদ প্রচার করছে তাতেও স্বাধীনতার কোনো ঘাটতি নেই। তাহলে কেন বলা হচ্ছে, বিশেষ সংস্থার হস্তক্ষেপে সংবাদপত্র স্বাধীন হতে পারছে না। অতিসত্ত্বর জরুরি অবস্থা তুলে নিতে হবে। হ্যাঁ, জরুরি অবস্থা অবশ্যই তুলে নিতে হবে, তবে এ জরুরি অবস্থা জারি করা জরুরি হয়েছিল কেন, সে অবস্থার জন্য কে বা কারা দায়ী? যদি আমরা আবার সে অবস্থায় ফিরে যেতে না চাই তাহলে সবাইকে সতর্ক হতে হবে, সচেতন হতে হবে, সংযত হতে হবে। এই দেশ আমাদের সবার, সবার স্বার্থে দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি উদার হতে হবে। এ কারণে কারো ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে অথবা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের কোনো সুযোগ নেই। সুযোগ নেই অকারণে অন্যকে দোষী সাব্যস্ত করারও।
শহীদুল হক খান
[সম্পাদক, দৈনিক যায়যায়দিন]
- Forums:
JUST VIEWED
Last viewed:
- স্বাধীনতার ঘোষক, হাইকোর্টের রায় এবং একটু অন্যরকম চিন্তা
- সুন্দর বনের জন্যে ভোট; দেশপ্রেম এবং কিছু প্রাসংগিক ভাবনা...
- সীমান্তের এপার ওপার (এপার) - পর্ব ৪
- সীমান্তের এপার ওপার (পত্মীতলার ডায়েরী) - পর্ব ৩
- সীমান্তের এপার ওপার - পর্ব ১
- Save Money on Transportation
- সীমান্তের এপার ওপার - পর্ব ২
- সীমান্তের এপার ওপার (ওপার) পর্ব ৬
- সীমান্তের এপার ওপার (এপার) - পর্ব ৫
- সিয়ার্স টাওয়ারের ১০৩ তলায় কাঁচের বারান্দা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
- সায়রা খান, নরওয়ে পার্লামেন্টে বাংলাদেশী এমপি
- Join Ami Bangladeshi
- সাইফুর রহমানের মৃত্যু এবং কিছু প্রশ্নঃ
- ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বেচে থাকাই আজ দেশ বাচানোর প্রথম শর্ত।
- শেষ নবাবের প্রত্যাবর্তন
Latest Blogs
- মফিজের ১৩ হাজার ও একজন বিভাস চন্দ্রের মৃত্যু...টাকার বস্তা পাহাড় বাইয়্যা যায়!
- ম্যাথিউ, হেরাল্ড ও আমি, এবং আমাদের ঘরে ফেরা
- একজন দরবেশ বাবার কেচ্ছা
- স্বপ্নের কালো বিড়াল ও একজন প্রবাসীর দেশে ফেরা
- একজন মূখ্যমন্ত্রী ও একজন চোরের কাল্পনিক সাক্ষাৎকারঃ
- সুরঞ্জিত বাবুর বীচি ও আমার চাওয়া পাওয়া
- মোহন ও আরিফের জন্যে জিল্লুর প্রেসিডেন্ট আছেন। ভয় নেই 'আমাদের'।
- ক্রসফায়ারই যদি একমাত্র সমাধান তাহলে কেন তাদের নয়?
- আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন জনাবা প্রধানমন্ত্রী
- জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও হিন্দু দেবতাদের রক্ত পিয়াস...
Recent Comments
- তৃপ্ত বিএনপি অতৃপ্ত সরকার
1 day 21 hours ago - ইলিয়াস আলীর দাফন হয়েছে পদ্মায়! -ফজলুল বারী
3 weeks 1 day ago - ড্রাইভার আজম কোথায় ...
3 weeks 1 day ago - সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে আইসিএক্স লাইসেন্স :
5 weeks 1 day ago - দিরাইয়ে আলিশান সেন মার্কেট উদ্বোধন : সমালোচনার ঝড়
5 weeks 1 day ago - শ্রীলংকার পত্রিকা এসব কি লিখছে!
5 weeks 3 days ago - বাণী চিরন্তনী | তারিখ: ০৯-০৪-২০১২
5 weeks 3 days ago - প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা বাংলাদেশের জন্য নয়
5 weeks 4 days ago - খুলনায় আটককৃত র্যাব সদস্য
5 weeks 6 days ago - ইতিহাসই বিচার করবে এই মহিলার
6 weeks 2 days ago





Post new comment