Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

-A A +A

ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বেচে থাকাই আজ দেশ বাচানোর প্রথম শর্ত।

বিডিআর বিদ্রোহ,দিন বদলের রাজনীতি আর দেশ বাচানোর প্রয়োজনীয়তা

শরীফ হোসাইন মৌন

বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে অনেক কথা হলো।অনেক লেখালেখি, আলোচনা, পর্যালোচনা হলো।অদক্ষ মন্ত্রী পরিষদের দায়িত্বজ্ঞানহীন উদ্দেশ্য প্রণোদিত বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া হলো।ঠেকায় পড়ে সেনা-বিদ্বেষী সুশীলদের আর্মি-প্রেমের মায়াকান্নার প্রতিযোগিতা হলো।ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান,ফিলিস্তিন,সোমালিয়ায় গনহত্যা পরিচালনাকারী মার্কিনিদের হাতে সুচারুভাবে এগিয়ে চলছে আমাদের বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত কাহিনী।দেখা যাক্ কী হয়! ইতিহাস কিন্তু সুখকর কোন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছেনা।আশা করা হচ্ছিল যে, আস্তে আস্তে বাংলাদেশ পরাশক্তির ষড়যন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হবে।দূতাবাসে গিয়ে কূটনীতিকদের কাছে নালিশ দেবার নির্লজ্জ প্রবনতার পরিসমাপ্তি ঘটবে।বহুজাতিক কোম্পানীর উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবীদের হাত থেকে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশ।আই,এম,এফ,বিশ্ব ব্যাংক,টিআইবির পাতানো ফাদ সৎ সাহসে আগ্রাহ্য করবে বাংলাদেশ। এই সব আশা আজ সুদূর পরাহত। ১/১১ তার বাহ্যিক চাকচিক্যের অবয়বে আবির্ভূত হয়ে পরাশক্তির ষড়যন্ত্রের চাদরে ঢেকে ফেলেছে আমাদের আরো শক্ত করে।অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সে ষড়যন্ত্র আরো সফলভাবে শিকড় গেড়েছে।
২১ অগাষ্টের গ্রেনেড হামলা,আব্দুস সামাদ আজাদের হত্যাকান্ড, হযরত শাহজালাল(রঃ)এর মাজারে বোমা বিস্ফোরনের পর আমাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে আমরা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইকে ডেকে আনি।অবস্থা তখন এমন ছিল যে,জোট সরকার যদি এফবিআইকে ঢেকে আনার দাবি প্রত্যাখ্যান করে শক্ত মেরুদন্ডের পররাষ্ট্রনীতি দাড় করাতে চায় তবে আওয়ামী মিডিয়া সেল বোমা হামলার দায়ে সরকারকে অভিযুক্ত করবে।যাই হোক সে তদন্তগুলোর কতটুকু কি হলো আমরা জানিনা।মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা তাদের তদন্তের রিপোর্ট আমাদের সরকারকে না জানালেও তাদের সরকারকে জানিয়েছে আমরা এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ।এবারেও বিডিআর বিদ্রোহের তদন্তের জন্য দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এফবিআই,স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড নামক সংস্থাকে।মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাটি তদন্তের পূর্বে ভারত হয়ে ঢাকায় আসে।তো এদের তদন্ত রিপোর্টে ভারতের মিডিয়ার প্রতিফলন কতটা দেখা যাবে তা সময়ই বলে দেবে।সম্প্রতি মার্কিন-ভারত-ইসরায়েল গোয়েন্দা সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে,পাঠক মাত্রই তা জানা থাকার কথা।ভাবলে অবাক হতে হয় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে জিজ্ঞাসাবাদ তথা তদন্ত করবে মার্কিন-ব্রিটিশ গোয়েন্দারা।যারা সাদ্দাম হোসেনের কাছে মরনাস্ত্রের সন্ধান পেয়েছিল কিংবা তালেবানদের কাছে পরমানু বোমা থাকার গোয়েন্দা রিপোর্ট দিয়েছিল।আসলে আমরা যখন দেশপ্রেমিক বলে নিজে নিজে গর্ব করি তখন আমরা ভুলে যাই যে,এই দক্ষিন এশিয়া তো দূরের কথা,পুরো এশিয়া মহাদেশে কোন রাষ্ট্রীয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা,বোমা হামলা,গুপ্ত হত্যা ঘটেনি যা আমেরিকার সিআইএ জড়িত ছিলনা।আমরা আবার তাদের কাছে সঠিক তদন্ত আশা করছি!মার্কিন গোয়েন্দারা নিশ্চয় না হেসে পারছেনা।আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেন আরেকটু বেশি আশাবাদী। আন্তর্জাতিক সংযোগ এ হামলায় জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখতে তিনি এফবিআইকে অনুরোধ করেছেন।এফবিআই যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তা কি তিনি ভুলে গেছেন?
যাই হোক আমাদের ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ন হলো।নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরেও ঢুকলো বিদেশী বাহিনী।শিয়ালের কাছেই আমরা মুরগী বর্গা দিলাম এবং স্বাধীনতার ফাকা বুলির খই ফুটিয়ে পরাশক্তির শৃঙ্খল গলায় জড়ালাম।
বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ভারত আমাদের শত্রু রাষ্ট্র।ভারত ছাড়া বাংলাদেশ চলেনা,সংকীর্ণ গুটিকয়েক হীনন্মন্য মানুষ ছাড়া এ সত্য বোধ হয় স্বয়ং ইন্ডিয়াও অস্বীকার করবেনা।বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা বিডিআরকে নিয়ে ইন্ডিয়ার ক্ষোভের অন্ত নেই।রৌমারী-বড়াইবাড়ি সীমান্তের বিএসএফ-এর আগ্রাসনের লজ্জাজনক পরাজয় ভারত ভুলেনি এবং ভুলেনা তাদের “পুশইন” আগ্রাসনে বিডিআরের বাধা দেবার কাহিনী।সীমান্তজুড়ে কাটাতারের বেড়া,চোরাচালান,নিরীহ গ্রামবাসী খুন,লাশ ফেরত না দেওয়া প্রভৃতি নিয়ে অহরহ বৈঠকই প্রমান করে বিডিআর ছিল ইন্ডিয়ার চক্ষুশূল।অপ-পরাশক্তির মদদে ১/১১ তে হঠাৎ বাহাদুর বনে যাওয়া সেনাবাহিনী প্রধানকে তাই ইন্ডিয়া অশ্ব উপহার দিলেও বিডিআরের ভাগ্যে জোটে শত্রুতা।বিডিআর ধ্বংস হলে তাই কার লাভ-ক্ষতি,তা বোঝার জন্য অতি জ্ঞানী হবার দরকার পড়েনা।ইন্ডিয়া যতই বলুক তারা আমাদের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে নাক গলাবে না,কিন্তু বিডিআর সংকটে তাদের নাক গলানের ব্যাপারটি আর গোপন করা গেলনা।কথায় কথায় বাংলাদেশে যারা আইএসআই-এর ঘাটি দেখতে পান,সেই পাকিস্তানে কেউ বিডিআর বিদ্রোহে মন্তব্য করেছে কিনা আমার অন্তত জানা নেই।আসলে বাংলাদেশে পাকিস্তানের আর কোন স্বার্থ অবশিষ্ট আছে কিনা সেটা বোঝার মোক্ষম সময় এখনই।না হলে ইন্ডিয়ান আগ্রাসন থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পাকিস্তান-জুজুর ভয় দেখানো অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকবে।
বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত যখনও শুরু হয় নাই,তখনই,এমনকি বিডিআর বিদ্রোহের দিন থেকেই ইন্ডিয়ার আচরন ছিল রহস্যময়।তাদের মিডিয়া সেল এক যোগে বিডিআর মহাপরিচালকের নিশ্চিত মৃত্যুর খবর প্রচার করে।তাদের এই অপরিসীম নিশ্চয়তার হেতু কি?অতি উদ্ধৃতি দিয়ে পাঠকের বিরক্তি উদ্রেক করবনা।ইন্ডিয়ান সরকার ও মিডিয়া নানা বক্তব্য-বিবৃতির সার কথা ছিল এই হামলার জন্য দায়ী জামায়াতে ইসলামী,সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং তথাকথিত জঙ্গিরা।এই সংকট মোকাবেলায় শেখ হাসিনা সরকারকে সামরিক-বেসামরিক সব ধরনের সহায়তা দেবার সত্যি-সত্যি প্রস্তুতির কথাও তারা জানায়।অবশ্য সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মানহানি মামলায় ভারত মিডিয়া কিছুটা চুপসে যায় এবং একই প্রচারনার হাল ধরেন আমাদের মন্ত্রিপরিষদ বিশেষত ট্রানজিট-টিফা চুক্তির জন্য রীতিমত উদগ্রীব বানিজ্য মন্ত্রী ফারুক চৌধুরী।
আওয়ামী মিডিয়া গোষ্ঠী গুরুত্বহীনভাবে প্রচার করলেও পাঠক ইতিমধ্যে জেনে গেছেন বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্য গুরু আওয়ামী নেতা তোরাব আলী ও তার পুত্র ছাত্রলীগ নেতা লেদার লিটনের চাঞ্চল্যকর কাহিনী।তবুও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বাকী মন্ত্রীরা হাস্যকরভাবে জঙ্গি-সূত্র খুজে পাচ্ছেন তথাকথিত তদন্ত সমাপ্তির পূর্বেই।তদন্ত রিপোর্ট কি তবে ইতিমধ্যে তারা তৈরী করে ফেলেছেন?
আরেকটি বিপজ্জনক খবর না বললেই নয়।সরকার হঠাৎ করেই ভারত বিরোধীতাকারীদের বিরুদ্ধে খড়গ-হস্ত হচ্ছেন। ভারত বিরোধীতা সরকার একদম সহ্য করছেনা। বিডিআর বিদ্রোহে ভারতের ষড়যন্ত্র নিয়ে লিফলেট বিতরনকালে সরকার হিযবুত-তাহরীর কর্মীদের গ্রেফতার করে।সুষ্ঠু তদন্তের দাবীতে আলোচনা শেষে বাসায় ফেরার পথে আওয়ামী পেটোয়া বাহিনীর আক্রমনের শিকার হয় বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা।আমরা দেখতে পাচ্ছি,ওপারের দাদাদের নিন্দা করলে এপারের দাদাদের বুকে ঘা লাগে।কিন্তু কেন? আওয়ামী লীগ ,ইন্ডিয়ার সাথে তার সখ্যতা আগে রেখে-ঢেকে রাখত অথচ এখন এমন রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিবেশেও সেই সখ্যতা তারা জোরশে গলায় বলে যাচ্ছে।জনগনের তথাকথিত শান্তিপূর্ন,সারিবদ্ধ ভোট দেবার নাটক আর মিডিয়া-ট্রায়াল ও পরাশক্তির সহায়তায় ক্ষমতারোহনের গোপন মাজেজা কি তারা ইতিমধ্যে আত্নস্থ করতে সক্ষম হয়ে জনগনের নিন্দাকে থোয়াই কেয়ার করে ভারতে-প্রেমের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে?
ইতিমধ্যে সরকার তদন্তকে ভিন্ন খাতে অথবা প্রকাশিতব্য আশু তদন্ত রিপোর্টকে আমাদের মনের সাথে অভিযোজিত করার কৌশল হিসেবে জঙ্গি-জঙ্গি বলে চেচাচ্ছে।সরকারের সিরিয়াস ভাব-ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে একটা বিরাট কিছুর আয়োজন চলছে পর্দার অন্তরালে।জঙ্গিদের গোপন আস্তানার খবর ইতিমধ্যে আমরা পেপারের পাতায় দেখার জন্য অপেক্ষায় রইলাম।জর্জ বুশ যেমন লাদেন-লাদেন আতন্ক সৃষ্টি করে তার দুবারের বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে,আপাত দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ সেই বিপজ্জনক কৌশল নিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
সেনা শাসনের দুবছরের দুর্নীতিকে পুজি করে বিদেশী ইন্ধনে যারা বিডিআরকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে তারা শতভাগ সফলকাম হয়েছে এটা বিনা তর্কে বলা যায়।বিডিআরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হত্যার ভেতর দিয়ে সেই পরিকল্পনার প্রাথমিক বাস্তবায়ন হয়েছে আর বিডিআর ধ্বংসের শেষ পেরেকটি ঠুকছে বর্তমান প্রশাসন,ঘটে যাওয়া ট্র্যাজিডির কারনে বিডিআরের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক ক্ষোভকে পুজি করে।সরকারী বেসরকারীভাবে শোক পালন করা হয়েছে বিডিআর কর্তৃক সেনা কর্মকর্তা হত্যার প্রতিবাদে!কিন্তু হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের সেনা কর্মকর্তা বলার মানে কি? তারা তো বিডিআরের কর্মকর্তা।নয়কি?তাদের পূর্ব পরিচয় সেনা কর্মকর্তা,সেটাকে ভুলভাবে ব্যবহার করে বিডিআরকে দোষ দেওয়া মারাত্নক ভুল।বলা উচিত ছিল বিডিআর-এর বিপদগামীদের হাতে বিডিআর কর্মকর্তা খুন।নিহত কর্মকর্তাদের দাফন-কাফনের ব্যবস্তা সেনাবাহিনী করলো কেন? বিডিআর করলোনা কেন?সেনাবাহিনী জড়ালো কেন?কারা জড়ালো?বিডিআরের মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল ইসলামকে।কিন্তু তার গায়ে বিডিআরের পোশাক কই?সরকার ইতিমধ্যে তার নেতৃত্বে কমিটি গঠন করেছে বিডিআরের নাম পরিবর্তন করার জন্য।কিন্তু কেন?পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকার এত ক্ষেপা কেন? ইদানিং আমরা টিভি পত্র-পত্রিকায় দেখছি তদন্তের নামে রিমান্ডে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে বিডিআরের জোয়ানদের খুন করে অসুস্থতা,হার্ট এ্যাটাক,আত্নহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।বিডিআর আর সেনাবাহিনীর সম্পর্কের মধ্যে যে আগুন লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে তার পেছনের কলকাঠি এখন কারা নাড়ছে।বিডিআর কি এসব ভুলে যাবে?না ভুলে যাওয়া সম্ভব?যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রু নিধনে নিয়োজিত না থেকে তারা যদি পরস্পরের দিকে অস্ত্র তাক করে তবে সে লাভ কার?
আসলে ইন্ডিয়া আর আওয়ামী লীগ একে অপরের পরিপূরক।যখন এক বন্ধু থামে তখন আরেক দোস্ত চলে।এভাবেই তারা তাদের মিশনকে গতিময় করে রাখে।মৌলবাদী জঙ্গি আতন্কে দেশ ভরে দিয়ে দেশের বিনিয়োগ তারা ইন্ডিয়ার নিয়ে যাচ্ছে।ইন্ডিয়ার বা পরাশক্তির চাওয়া-পাওয়া ও মিডিয়ার বক্তব্য-বিবৃতি,সংস্কৃতি যেন আওয়ামী আকাঙ্খার সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে।এই দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বেচে থাকাই আজ দেশ বাচানোর প্রথম শর্ত।
২৪/০৩/২০০৯ ইং
শরীফ হোসাইন মৌন
E-mail: sharif5may2005@yahoo.com

Comments

Post new comment

CAPTCHA
Required to prevent spam.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla