ঘুরে এলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন - ৪র্থ পর্ব
রাজ্যের ক্লান্তি, তবুও সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল। জানালার পর্দাটা সড়িয়ে দিতেই সকালের র্মিষ্টি আলো ভাসিয়ে নিল হোটেল রুমটা। পাহাড়ের কোল ঘেষে সান্তা ফে রুটের মালবাহী ট্রেনটার হেলেদুলে চলা মনে করিয়ে দিল দাদা বাড়ির কথা। ’৭১এ যুদ্বের মাসগুলো এ ভাবে জানালা খুলে তাকিয়ে দেখতাম ট্রেনের আসা যাওয়া। খোলা মালগাড়িতে পাকিস্তানী সেনারা ট্যাংক কামান নিয়ে সদর্পে ঘুরে বেড়াত গঞ্জের অলিগলিতে বয়ে যাওয়া লাইন ধরে। মাঝে মধ্যে বিনা কারণে গোলাগুলি করে প্রকম্পিত করে ফেলত চারদিক। শান্তি কমিটি এবং রাজাকারের দল সাড়িবদ্ব হয়ে স্বাগত জানাত তাদের অপকর্মের গুরুদের। ডিসেম্বর আসতেই বদলে গেল সে দৃশ্য, পাকিস্তানীরা দলে দলে পালাতে লাগল পাগলের মত। ৯ই ডিসেম্বরে উড়িয়ে দিল রেল লাইনের ছোট সেতুটা। কতই বা বয়স ছিল আমার! চোখ বুঝলে আজও ফিরে যাওয়া যায় সে দিনগুলোতে; জোৎস্নার প্লাবনে ভেসে যাওয়া সর্ষে ক্ষেতের আইল ধরে হাটছি আমি, অন্তহীন সে পথ। বাড়ি হতে মাইল খানেক দূরে ষ্টেশনে দাড়িয়ে থাকত মাল টানার ঘোড়াগুলো, খদ্দের না পেয়ে গঞ্জে ফিরে যাওয়ার মুখে চড়ে বসেছি একটা ঘোড়ায় অল্প কিছু সেলামীর বিনিময়ে। মনকাড়া প্রকৃতি আর কৈশোরের চাপা উত্তেজনায় মিশে সে যাত্রা মনে হত স্বর্গ যাত্রার মত। গোরস্থানের মোড়ে আসতেই নেমে পরতাম, বাকি পথ পায়ে হেটে বাড়ি পৌছে মিশে যেতাম ভাই-বোনদের ভীড়ে। বাবা কখনোই চাইতেন না ষ্টেশনের ধার কাছে যাই, তাই লুকাতে চেষ্টা করতাম আমার গোপন মিশন। এভাবেই কেটে গেল বেশ ক’টা মাস। ষ্টেশনে দাড়িয়ে চলমান ট্রেন দেখছিলাম একদিন, হঠাৎ থেমে গেল সৈন্য ভর্ত্তি ট্রেনটা। বিদ্যুৎ গতিতে ওরা নেমে এল, সামনে যাকে পেল জোড় করে তুলে নিল ট্রেনে। আমিও বাদ গেলাম না।
তন্ময় হয়ে মনে করছিলাম দিনগুলোর কথা। স্ত্রী পাশে এসে দাড়িয়েছে টের পাইনি। ‘ঈদ মোবারক‘! স্প্যনিশ উচ্চারনের শব্দটা মুহুর্তের মধ্যে আমাকে ফিরিয়ে আনল ২০০৯ সালে। আরে তাই ত, আজ না ঈদ! দ্রুত ফোন করে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের ঈদ মোবারক জানালাম। বেলা বাড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। স্ত্রী তাড়া দিল, বেরিয়ে পরতে হবে আমাদের। গোসল এবং হোটেলে ফ্রি ব্রেকফাষ্ট সেড়ে রওয়ানা দিতে প্রায় দশটা বেজে গেল।
রোববার সকাল, তাই হাইওয়ে ট্রাফিক ছিল হাতে গোনার মত। আবারও আই-৪০ ধরে পশ্চিম দিকে যাত্রা। সকাল হতে আকাশ জুড়ে মেঘের রাজত্ব, মাইল দশেক না এগুতেই আকাশের বাধ ভেঙে পরল যেন। ঝাপিয়ে বৃষ্টি এল। যতদূর চোখ যায় বৃষ্টি আর বৃষ্টি। এমন ভারী বৃষ্টিতে গাড়ি চালাতে অন্যরকম আনন্দ পাওয়া যায়। প্রাণ ভরে উপভোগ করলাম অনেকদিন পর দেখা পাওয়া মুষলধারের বৃষ্টি। বেশীক্ষন স্থায়ী হলনা এ আনন্দ, মিনিট দশেকের পথ পাড়ি দিতেই ভোজবাজির মত হাওয়া হয়ে গেল মেঘরাজ্য। গ্রীষ্মের ফক ফকা সূর্য্যটা যেন ওৎ পেতে অপেক্ষায় ছিল আমাদের। গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাম আশপাশে কাউকে না দেখে, ৯০ মাইল/ঘন্টা। ৩৫ মাইল পেরিয়ে ১৬৫ এক্সিটে বের হয়ে গেলাম আই-৪০ হতে। এরপর আরও ৬৫ মাইলের পথ। ঝকঝকে এক লেনের রাস্তায় গাড়ি চালাতে একটু বেখাপ্পা লাগল, সামনের স্লো গাড়িকে এড়ানোর রাস্তা বন্ধ। কিছুদূর এগুতেই বিপরীত দিক হতে ধেয়ে আসা গাড়িটা তিনবার হেড লাইট জ্বালিয়ে কি একটা বুঝাতে চাইল যেন। পুলিশ! নিশ্চয় সামনে কোথাও পুলিশ ওৎ পাতে আছে স্পীড মিটার নিয়ে। দু’মিনিট না যেতেই আমার সন্দেহ সঠিক হল, হাইওয়ে পেট্রোল পুলিশ মনিটর করছে গাড়ির স্পীড। মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম পার হয়ে যাওয়া গাড়িটাকে। ৬৫ মাইল স্পীডের রাস্তায় ৮০ মাইল যাচ্ছিলাম এতক্ষন, বড় ধরনের জড়িমানা হতে বেচে গেলাম এ যাত্রায়।
গ্রান্ড ক্যানিয়ন যতই এগিয়ে আসছিল ভেতরের উত্তেজনাটা ততই বাড়ছিল। কিছুক্ষন পর পর হরেক রকমের বিলবোর্ড মনে করিয়ে দিচ্ছিল গন্তব্যস্থল হতে আমরা আর বেশী দূরে নই। দু’দিকের ঘন বন হতে সহাসাই হরিনের দল রাস্তা অতিক্রম করতে পারে এমন সাইন দেখা গেল যত্রতত্র। পুরো এলাকাটাই কেন জানিনা নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড হতে রটরোয়া পর্য্যন্ত লম্বা ড্রাইভের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও নিউজিল্যান্ডের ও পথটা ছিল র্দুঘটনার শিকার পশুদের রক্তে একাকার, আরিজোনার এ পথটায় এমন কিছু চোখে পরলনা। দূর হতে আইম্যাক্স সিনেমা হলটা চোখে পরতেই বুঝে নিলাম পৌছে গেছি গন্তব্যে।
-চলবে

- WatchDog's blog
- 738 reads
-
JUST VIEWED
Last viewed:
- ঘুরে এলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন - ৩য় পর্ব
- ঘুরে এলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন - ২য় পর্ব।
- ঘুরে এলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন - ১ম পর্ব
- গোপনেই ভারতকে দিয়ে দেয়া হবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা?
- গাঞ্জার নৌকা পাহাড় বাইয়্যা যায়
- খুলনায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সৎকার
- খাল কেটে কুমির আনল বাংলাদেশ ক্রিকেট
- খালেদা জিয়ার জন্মদিনঃ ডকুমেন্ট
- ক্রশফায়ার, রাজনীতির ব্যর্থতা না ব্যর্থতার রাজনীতি?
- এক সশস্ত্র নেত্রীর উপাখ্যান, কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগের নেত্রী একে ৪৭সহ গ্রেপ্তার
- মাফিয়া চুন্নি যেভাবে কোটিপতি
- History of American Sign Language
- News Archive
- রংপুরের চতরা ইউনিয়ন বনাম কোপেনহেগেনের বিশ্ব জলবায়ু সন্মেলন...
- Crime & Punishment, No1 - Pobon (Son of Delwar Hossain)
Latest Blogs
- মফিজের ১৩ হাজার ও একজন বিভাস চন্দ্রের মৃত্যু...টাকার বস্তা পাহাড় বাইয়্যা যায়!
- ম্যাথিউ, হেরাল্ড ও আমি, এবং আমাদের ঘরে ফেরা
- একজন দরবেশ বাবার কেচ্ছা
- স্বপ্নের কালো বিড়াল ও একজন প্রবাসীর দেশে ফেরা
- একজন মূখ্যমন্ত্রী ও একজন চোরের কাল্পনিক সাক্ষাৎকারঃ
- সুরঞ্জিত বাবুর বীচি ও আমার চাওয়া পাওয়া
- মোহন ও আরিফের জন্যে জিল্লুর প্রেসিডেন্ট আছেন। ভয় নেই 'আমাদের'।
- ক্রসফায়ারই যদি একমাত্র সমাধান তাহলে কেন তাদের নয়?
- আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন জনাবা প্রধানমন্ত্রী
- জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও হিন্দু দেবতাদের রক্ত পিয়াস...
Recent Comments
- তৃপ্ত বিএনপি অতৃপ্ত সরকার
1 day 13 hours ago - ইলিয়াস আলীর দাফন হয়েছে পদ্মায়! -ফজলুল বারী
3 weeks 1 day ago - ড্রাইভার আজম কোথায় ...
3 weeks 1 day ago - সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে আইসিএক্স লাইসেন্স :
5 weeks 1 day ago - দিরাইয়ে আলিশান সেন মার্কেট উদ্বোধন : সমালোচনার ঝড়
5 weeks 1 day ago - শ্রীলংকার পত্রিকা এসব কি লিখছে!
5 weeks 3 days ago - বাণী চিরন্তনী | তারিখ: ০৯-০৪-২০১২
5 weeks 3 days ago - প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা বাংলাদেশের জন্য নয়
5 weeks 4 days ago - খুলনায় আটককৃত র্যাব সদস্য
5 weeks 6 days ago - ইতিহাসই বিচার করবে এই মহিলার
6 weeks 2 days ago






Comments
Post new comment