ঘুরে এলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন - ২য় পর্ব।

হাইওয়েতে ড্রাইভ করার এ এক যন্ত্রণা, চারদিকের চোখ জুড়ানো দৃশ্যগুলোকে অন্ধের মত এড়াতে হয়। ৮০-৯০ মাইল বেগে (১২৮-১৪৪ কিঃমিঃ) গাড়ি চালাতে গেলে চোখ এদিক সেদিক করার কোন উপায় থাকেনা, সামান্য হের ফের হলেই আজরাইল বাবাজীর খপ্পরে ধরা দিতে হয় শেষ দোয়া না পড়েই। ঝকঝকে রাস্তা ধরে একনাগাড়ে ড্রাইভ করলে আরও একটা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তন্দ্রা! যাই হোক, চারদিকের নয়নাভিরাম দৃশ্য, ঢুলু ঢুলু নিদ্রা এবং ডাইনাসোর সমান ট্রাক গুলোকে টেক্কা দিয়ে নিউ মেক্সিকো পার হয়ে আরিজোনা সীমান্তে পৌছে গেলাম অক্ষত অবস্থায়। পাহাড়ের কোল ঘেষে রেড ইন্ডিয়ানদের বিক্ষিপ্ত বসতি, মাইলের পর মাইল জুড়ে সবুজের ছড়াছড়ি আর রেঞ্চগুলোতে পশুদের অলস চলাফেরা; অন্ধের মত ড্রাইভ করলেও এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় ছিলনা, এ সবের গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
হলব্র্যুক এবং নাভাখো এলাকার মাঝামাঝি ৩১১ এক্সিট ধরে হাইওয়ে হতে বেরিয়ে গেলাম। সরু রাস্তা ধরে কিছুটা পথ যেতেই পার্কে যাওয়ার গেট্টা চোখে পরল। ঘড়ির কাটা ইতিমধ্যে ৪টা অতিক্রম করে ফেলেছে এবং পার্ক বন্ধ হবে ৬টায়, একটু চিন্তায় পরে গেলাম সময় নিয়ে। ১০ ডলার এন্ট্র ফি দিয়ে ঢুকতেই খেয়াল হল নিউ মেক্সিকোর সাথে আরিজোনার এক ঘন্ট সময় পার্থক্য রয়ে গেছে, অর্থাৎ সময় এখন ৪টা নয় বরং দুপুর ৩টা। পার্কে ঢুকার সময় ধারণা ছিল হয়ত একটু এগুলেই সাড়ে বাইশ কোটি বছর পুরানো গাছগুলো চোখে পরবে। কিন্তূ বাস্তবে তা ঘটলনা, আমরা এগুচ্ছি আর দূরের পার্ক এবং পাহাড়গুলো যেন ততই পেছাচ্ছে। এ যেন গাধার নাকে মূলা বেধে সাহেবের শহর যাত্রা! একে একে ২৮ মাইল ড্রাইভের পর চোখের সামনে যে দৃশ্য ভেসে উঠল তা দেখে আমরা দু’জনেই স্তব্দ। একদিকে ভিন্ন রঙে সাজানো পাহাড়ের নৈশব্দিক বিশালতা, পাশাপাশি যতদূর চোখ যায় কোটি কোটি বছর আগের বিবর্তিত গাছের গোড়া। প্রথম টুকরাটা হাত দিতেই পরিস্কার হয়ে গেল ব্যাপারটা, বাইরে হতে একে গাছের টুকরা মনে হলেও ভেতরের সবটা জুড়ে আছে শক্ত পাথর। শুধু পাথর বল্লে ভূল বলা হবে, এ যেন শিল্পীর নিপুন হাতের ছোয়ার সৃষ্ট শিল্পকর্ম। হরেক রকম রঙের সমষ্টিতে কে যেন আল্পনা একে রেখেছে প্রতিটা গুড়িতে; লাল, নীল, বাদামী, ধূসর, কালো গুনে শেষ করার উপায় নেই।
বলা হয় প্রি-মিনেরালাইজড্ কাঠগুলো Aruacariaceae পরিবারের সদস্য যা উত্তর গোলার্ধে বিলীন হয়ে গেলেও দক্ষিন গোলার্ধের কয়েকটা জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে টিকে আছে। Triassic যুগে (১৯৯ হতে ২৫১ মিলিয়ন বছর বিস্তৃত) এই এলাকাটা ছিল ট্রপিক্যাল আবহাওয়ার আওতায়। এক সময় প্রবল মৌসুমী বন্যা বনের গাছগুলো উপড়ে নিয়ে যায় নদীর মোহনায়। নদীর তীর জুড়ে বালু সমুদ্রে ডুবে যায় গাছগুলো। আর এই বালুতে প্রাধান্য ছিল লাভার ছাই, যাতে মিশ্রিত ছিল সিলিকা। এই সিলিকাই সয়াহক হিসাবে কাজ করেছে প্রি-মিনেরালাইজড্ বিবর্তনে। কোটি কোটি বছর ধরে লোহা এবং ম্যাংগানাইজের প্রভাবে গাছগুলোতে এসেছে রং’এর বিবর্তন। এভাবেই কেটে গেছে সাড়ে বাইশ কোটি বছর। মাটিতে শুয়ে থাকা গাছগুলোর সামনে দাড়ালে এক ধরনের ঠান্ডা অনুভূতি মগজকে গ্রাস করে নেয়, সাড়ে বাইশ কোটি বছর আগে কেমন ছিল আমাদের পৃথিবী? দেখতে কেমন দেখাত আমাদের অতীত বংশধরদের? এ সব প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্যে এখানে প্রতিনিয়ত কাজ করছে আর্কিওলজিষ্টরা, সাথে আছে ইতিহাসবিদ এবং মনোবিজ্ঞানীর দল। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, এবার ফেরার পালা। কেন জানি মনটা খারাপ হয়ে গেল জায়গাটা ছেড়ে যেতে, এ যেন মার জড়ায়ু হতে নিজকে বিচ্ছিন্ন করা।
ঢুকার পথেই রেঞ্জারের দল হুসিয়ার করে দিয়েছিল গাছের গোড়া না কুড়াতে, ধরা পরলে জেল জরিমানা। কিন্তূ লোভ সামলাতে পারলাম না। যা হয় হবে এ ভেবে এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে ছোট্ট একটা টুকরা পকেটে ঢুকিয়ে ফেল্লাম। ২২.৫ কোটি বছর আগের চিন্হ হাতে পাওয়ার এমন র্দুলভ সূযোগের লোভ সামলানো বেজায় কঠিন প্রতীয়মান হল। ফিরতি পথে ইয়া নফ্সি ইয়া নফ্সি ঝপে পার্ক exit’এ আসতেই দেখলাম মূল ফটক বন্ধ (অটোমেটিকভাবে খুলে যায় গাড়ি সামনে এলে)। রেঞ্জারদের গাড়ি চেক করার কথা, এ জন্যে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাড়িয়ে কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে হল। কিন্তূ কেউ এল না, ডানে বায়ে না তাকিয়ে দম নিয়ে চাপ দিলাম এক্সিলারেটরে। হাইওয়েতে ঢুকতেই স্ত্রীকে জানালাম চুরির ব্যাপারটা। হায় হায় করে উঠল সে, কিন্তূ টুকরাটা কেড়ে নিয়ে পকেটে ভরে ফেল্ল ক্রিসমাস ছুটিতে নিজ দেশে নিয়ে যাবে বলে। আমি শুধু কপাল হাতরালাম, কেন বড় একটা টুকরা চুরি করতে গেলাম না! ঢাকা মিউজিয়ামে দান করলে আমার নামটা নিশ্চয় শতাব্দি ধরে বেচে থাকত! চোর পালালে বুদ্বি বাড়ে! পার্কের রেশ কাটিয়ে ড্রাইভং’এ মন দিতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল। ততক্ষনে পশ্চিম দিগন্তে সূর্য্যটা হেলে পরেছে, পাহাড়ের চূড়াগুলোতে নেমে এসেছে ভৌতক নীরবতা। পাশের সীটে গৃহিনী কখন ঘুমিয়ে পরেছে টের পাইনী, হাল্কা ভল্যিউমে বাউল সম্রাট আবদুল করিমের 'এই দুনিয়া মায়ার জালে বান্ধা' গানটা ছেড়ে দিয়ে হারিয়ে গেলাম পথচলার সমুদ্রে। পরবর্তী ঠিকানা গ্রান্ড ক্যানিয়নের কাছাকাছি ছোট্ট শহর Flagstaff।
- চলবে


NB: Theft
Theft of petrified wood has remained a problem despite protection and despite the fact that nearby vendors sell wood collected legally from private land. Despite a guard force of seven National Park Service rangers, fences, warning signs, and the threat of a $325 fine, an estimated 12 tons of the fossil wood is stolen from the Petrified Forest every year. Source: Wikipedia




- WatchDog's blog
- 1004 reads
-
JUST VIEWED
Last viewed:
- ঘুরে এলাম গ্রান্ড ক্যানিয়ন - ১ম পর্ব
- গোপনেই ভারতকে দিয়ে দেয়া হবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা?
- গাঞ্জার নৌকা পাহাড় বাইয়্যা যায়
- খুলনায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সৎকার
- খাল কেটে কুমির আনল বাংলাদেশ ক্রিকেট
- খালেদা জিয়ার জন্মদিনঃ ডকুমেন্ট
- ক্রশফায়ার, রাজনীতির ব্যর্থতা না ব্যর্থতার রাজনীতি?
- এক সশস্ত্র নেত্রীর উপাখ্যান, কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগের নেত্রী একে ৪৭সহ গ্রেপ্তার
- মাফিয়া চুন্নি যেভাবে কোটিপতি
- History of American Sign Language
- News Archive
- রংপুরের চতরা ইউনিয়ন বনাম কোপেনহেগেনের বিশ্ব জলবায়ু সন্মেলন...
- Crime & Punishment, No1 - Pobon (Son of Delwar Hossain)
- Welcome home to Bhuiya & Gong!
- Sheikh family and dark of the moon
Latest Blogs
- মফিজের ১৩ হাজার ও একজন বিভাস চন্দ্রের মৃত্যু...টাকার বস্তা পাহাড় বাইয়্যা যায়!
- ম্যাথিউ, হেরাল্ড ও আমি, এবং আমাদের ঘরে ফেরা
- একজন দরবেশ বাবার কেচ্ছা
- স্বপ্নের কালো বিড়াল ও একজন প্রবাসীর দেশে ফেরা
- একজন মূখ্যমন্ত্রী ও একজন চোরের কাল্পনিক সাক্ষাৎকারঃ
- সুরঞ্জিত বাবুর বীচি ও আমার চাওয়া পাওয়া
- মোহন ও আরিফের জন্যে জিল্লুর প্রেসিডেন্ট আছেন। ভয় নেই 'আমাদের'।
- ক্রসফায়ারই যদি একমাত্র সমাধান তাহলে কেন তাদের নয়?
- আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন জনাবা প্রধানমন্ত্রী
- জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও হিন্দু দেবতাদের রক্ত পিয়াস...
Recent Comments
- তৃপ্ত বিএনপি অতৃপ্ত সরকার
1 day 13 hours ago - ইলিয়াস আলীর দাফন হয়েছে পদ্মায়! -ফজলুল বারী
3 weeks 1 day ago - ড্রাইভার আজম কোথায় ...
3 weeks 1 day ago - সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে আইসিএক্স লাইসেন্স :
5 weeks 1 day ago - দিরাইয়ে আলিশান সেন মার্কেট উদ্বোধন : সমালোচনার ঝড়
5 weeks 1 day ago - শ্রীলংকার পত্রিকা এসব কি লিখছে!
5 weeks 3 days ago - বাণী চিরন্তনী | তারিখ: ০৯-০৪-২০১২
5 weeks 3 days ago - প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা বাংলাদেশের জন্য নয়
5 weeks 4 days ago - খুলনায় আটককৃত র্যাব সদস্য
5 weeks 6 days ago - ইতিহাসই বিচার করবে এই মহিলার
6 weeks 2 days ago





Comments
Post new comment