Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

Ami Bangladeshi

-A A +A

Reply to comment

৭৫'এর মিষ্টি বনাম ১০'এর মিষ্টি

হুইপ ফিরোজকে নিয়ে বরিশালে তোলপাড়

আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো
বরিশাল-পটুয়াখালী এবং রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিলি হওয়া একটি ভিডিও সিডি নিয়ে তোলপাড় চলছে। সিডিতে দেয়া তথ্যচিত্র অনুযায়ী, ’৭৫-র ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বরিশাল শহরে বের হওয়া প্রথম আনন্দ মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাতীয় সংসদের বর্তমান হুইপ বাউফলের এমপি আসম ফিরোজ। এই মিছিল থেকেই হামলা হয় বরিশালের আওয়ামী লীগ অফিসে। বিভিন্ন সরকারি দফতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে ভাংচুর করে মিছিলকারীরা। হত্যার প্রতিবাদে বের হওয়া মিছিলেও হামলা চালায় তারা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে আলোচ্য ভিডিওচিত্রে ফিরোজসহ সেসময়কার অন্য বেঈমানদের বিচার দাবি করেছেন স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এদিকে পুরো ঘটনাটিকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন হুইপ আসম ফিরোজ। ছাত্রজীবনের রাজনীতিতে সৃষ্ট বিরোধের জের এবং তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য এরকম অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
ভিডিওচিত্রটি কে বা কারা প্রকাশ করেছে তা জানা যায়নি। ভিডিও তথ্যের সত্যতা নিয়ে কোনরকম সংশয় প্রকাশ করেননি স্থানীয় বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা। তথ্যচিত্রটিতে রয়েছে দু’জন সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতার সরাসরি সাক্ষাৎকার। তারা হলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বরিশালে প্রতিবাদ মিছিল করার অপরাধে প্রথম কারাবরণকারী তৎকালীন ছাত্রনেতা বর্তমানে কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সাবেক বাকসু ভিপি খান আলতাফ হোসেন ভুলু এবং সেই সময়কার আরেক ছাত্রনেতা বর্তমানে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ বরিশাল জেলা শাখার সহ-সভাপতি ডা. পীযূষকান্তি দাস। তারা দু’জনই ক্যামেরার সামনে অকপটে বলেছেন সবকিছু। খান আলতাফ হোসেন ভুলু বলেন, ‘১৫ আগস্ট সকালে হত্যাকাণ্ডের খবর জানার পর একে একে সদর রোডের আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে জড়ো হতে থাকি আমরা। এ সময় সেখানে আসেন বর্তমান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা তরুণ কুমার দেব, আওয়ামী লীগ নেতা মুনছুরুল আলম মন্টু, তৎকালীন ছাত্রনেতা ডা. পীযূষ কান্তি দাস এবং শহিদ খান। অফিসে এসে পাই আরেক আওয়ামী লীগ নেতা কেশবদা’কে। আমরা কয়েকজন মিলে হত্যার প্রতিবাদে মিছিল বের করি। মিছিলটি বিবিরপুকুর এলাকা অতিক্রমকালে বিপরীত দিক থেকে একটি মিছিল নিয়ে আসেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ আসম ফিরোজ। মিছিলে তিনি ছাড়াও নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মোশতাক সরকারের পক্ষে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ছোট ভাই। মূলত মঞ্জুর বগুড়া রোডস্থ বাসা থেকেই বের হয় ওই মিছিল। এর আগে সেখানে আনন্দ উল্লাস আর মিষ্টি বিতরণ করেন ফিরোজসহ অন্যরা।’ ডা. পীযূষ কান্তি দাস তার সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আসম ফিরোজের নেতৃত্বাধীন মিছিল থেকে ধাওয়া করা হলে আমরা দ্রুত সদর রোড সংলগ্ন একটি গলির ভেতরে ঢুকে পড়ি। এরপর আনন্দ মিছিলকারীরা অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে থাকা আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালায়। সেখানে মিছিলকারীরা বঙ্গবন্ধুর ছবি ভাংচুর ও পদদলিত করে। এরপর একে একে নগরীর বিভিন্ন সরকারি দফতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামিয়ে ফেলা এবং ভাংচুর করা হয়। বিএম কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ এমদাদুল হক মজুমদারকেও লাঞ্ছিত করে তারা। বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন হওয়াই ছিল তার একমাত্র অপরাধ।’ ভিডিওচিত্রে দু’জনের দেয়া এ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে আলাপকালে বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘সেদিনের সেই দৃশ্য বহু মানুষ স্বচক্ষে দেখেছে। কেবল ভাংচুরই নয়, পা দিয়ে মাড়িয়ে ভাংচুর করা হয় জাতির জনকের ছবি। এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৯ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ। বিষয়টি টের পেয়ে শুরু হয় দমন অভিযান। ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয় বরিশালের তৎকালীন এসপিকে। ১৭ আগস্ট সদর রোড থেকে গ্রেফতার হন আলতাফ হোসেন ভুলু। এরপর একে একে গ্রেফতার করা হয় বর্তমান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, বিপ্লবী দেবেন্দ নাথ ঘোষ, অ্যাডভোকেট মানবেন্দ বটব্যাল, হরনাথ বাইন, কাজী মোখলেছুর রহমান, হোসেন চৌধুরী, আকতার উদ্দিন দারোগা, আলেকান্দার নুরু, শ্রমিক নেতা রুস্তম সরদার এবং ছাত্রনেতা সাজুসহ আরও অনেককে। দমন পীড়নের মুখে থমকে যায় প্রতিবাদ।’ ভিডিওচিত্রে সাক্ষাৎকার দেয়া স্বাচিপ নেতা ডা. পীযূষ কান্তি দাস বলেন, সে সময় এদের গ্রেফতার এবং নির্যাতনে সহায়তা করেন তৎকালীন বিএম কলেজের এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র বর্তমান হুইপ আসম ফিরোজ। আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম মঞ্জু গ্র“পের নেতা হিসেবে এসব কাজ করেন তিনি। পরে মোশতাক সরকারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয় মঞ্জুর।’ ক্ষোভের সুরে আলতাফ হোসেন ভুলু যুগান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতার লোভে বঙ্গবন্ধুকে অপমান করা ফিরোজ এখন জাতীয় সংসদের হুইপ। এর আগে পরপর ৪ বার তাকে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এই লজ্জা আমরা রাখব কোথায়? আজ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দাবি উঠেছে, এসব বেঈমানেরও বিচার হোক।’

হুইপ ফিরোজের বক্তব্য
পুরো বিষয়টি সম্পর্কে আলাপকালে হুইপ আসম ফিরোজ যুগান্তরকে বলেন, ‘বিএম কলেজে আমার অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আলতাফ হোসেন ভুলু। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমার কাছে পরাজিত হন তিনি। সে সময় বরিশালের সবকটি কলেজের ছাত্র সংসদে জয়ী হয় আমার সমর্থকরা। এ নিয়ে তখন থেকেই আমার সঙ্গে ভুলু সাহেবের বিরোধ চলছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রশ্নে আমি নুরুল ইসলাম মঞ্জু গ্র“পের সমর্থক ছিলাম। অন্যদিকে আমাদের বিপক্ষে ছিলেন হাসানাত আবদুল্লাহসহ অন্যরা। মঞ্জু গ্র“পের সমর্থক হলেও ১৫ আগস্ট সকালের ওই আনন্দ মিছিলে আমি অংশ নেইনি। কোনরকম আনন্দ উল্লাসও করিনি। দল যখন বিরোধী দলে থাকে তখন আমার বিরুদ্ধে কোন কথা ওঠে না। কিন্তু দল ক্ষমতায় এলেই একটি মাফিয়া চক্রের মদদে ভুলু সাহেবরা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে মেতে ওঠেন। কেননা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমার কিছু পাওয়ার সুযোগ হয়। তাদের মদদ দেয়া মাফিয়া চক্রটি আমাকে সরিয়ে বাউফলের নির্বাচনী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার আশাতেই এসব করছে। অথচ যে অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে তোলা হচ্ছে তার বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। ১৯৭৮ সালে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে আমি বরিশালের প্রতিনিধিত্ব করেছি। বঙ্গবন্ধুর মাজারে ফুল দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগের তদন্ত পর্যন্ত হয়েছে। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন সেই তদন্ত কমিটির প্রধান। তদন্তে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। দক্ষিণাঞ্চলে একমাত্র আমিই ৫ বার এমপি নির্বাচিত হয়েছি। ’৮৬-তে স্বতন্ত্র হিসেবেও আমাকে নির্বাচিত করে বাউফলের জনগণ। বহুবার লোভ দেখানো এবং মন্ত্রিত্বের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও কখনও আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাইনি। দলের প্রতি বিশ্বস্ততা ও ভালোবাসা না থাকলে অনেক আগেই পতাকা ওড়ানো গাড়িতে উঠতে পারতাম।’

Reply

CAPTCHA
Required to prevent spam.
Image CAPTCHA
Enter the characters shown in the image.
Write in Bangla