'মহামান্য' আদালতের কেনিয়ান ম্যারাথন...

ভেতরের খবর না রাখলে বাইরে হতে মনে হবে বাংলাদেশে হয়ত কোন ক্যূ ঘটে গেছে। সেনা ক্যূ ও মার্সেনারীদের ক্যু’র সাথে আমাদের কমবেশি পরিচয় আছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে বিচার ব্যবস্থা একটা দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিপতি বনে যায় এমন উদাহরণ খুবই বিরল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে নয় বরং ভোট দিয়েছে দেশের উচ্চ আদালতকে। শুরুটা যদিও ইতিহাস দিয়ে কিন্তু আদালতের লম্বা হাত এখন জানজট হতে শুরু করে বোরখা পর্যন্ত। ’মহামান্য’ বিচারকদের পুণ্যস্থান আদালত অবমাননা নিয়ে মামলা হচ্ছে দফায় দফায়। ক্ষমতাসীন দল ছাড়া দেশের বাকি সব রাজনৈতিক দল আদালতের বদান্যতায় এখন দৌড়ের উপর। আওয়ামী লীগ এবং এর নেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কার্যক্রমকে যারা কাছ হতে অবলোকন করেছেন তাদের জানা থাকার কথা বিরোধী দল নিয়ে নেত্রীর ফিলোসফি। বিগত বছরগুলোতে শেখ হাসিনা যা বলেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত তা বাস্তবায়ন করছে অনেকটা কেনিয়ান দৌড়বিদদের ম্যারাথন দৌড়ানোর কায়দায়। বিচার ব্যবস্থা কি তাহলে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের স্বর্গভূমি হয়ে গেল? গত এক মাসে উচ্চ আদালতে যা হয়েছে তার হিসাব মেলালে মনে হবে বিচারকগণ কত দ্রুত শেখ হাসিনার মন জয় করা যায় সে প্রতিযোগীতায় নেমেছেন।
৭২ হতে ৭৫ পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসন এবং এরশাদ উত্তর আওয়ামী লীগের পাঁচ বছর ছাড়া বাংলাদেশের সব শাসন এখন অবৈধ (খালেদা জিয়ার শাসন! হুম, না হাসলেও চলবে বোধহয়)। এমনটাই মনে করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। শাসনতন্ত্রের ৫ম ও ৭ম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াকে কবর হতে আর জেনারেল এরশাদকে ক্ষমতার হানিমুন হতে টেনে ফাঁসিতে ঝুলানোর রাস্তা পাকা করে দিয়েছে আইন ও বিচার ব্যবস্থা। এখন দেখার বিষয় সে পথে ক্ষমতাসীন দল কতটা পথ পাড়ি দেয়। নিন্দুকেরা বলেন ১৯৭২ সালে পাকিস্তান ফেরত শেখ মুজিবের ক্ষমতা গ্রহনও ছিল অগনতান্ত্রিক। অবিভক্ত পাকিস্তানের ৭০’এর নির্বাচনে দেশের জনগণ এই নেতাকে ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্যে, বাংলাদেশের সরকার অথবা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্যে নয়। নিন্দুকেরা আরও বলেন ৭৪-৭৫’এর বাকশালও ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নির্লজ্জ লংঘন। এ দেশের মানুষ ৭২’এর শেখ মুজিবকে শুধু জাতির পিতা কেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার সাথে তুলনা করতেও দ্বিধা করেনি। বাকশাল নিয়েও জনগণ রাস্তায় নামেনি। কারণ এগুলো ছিল সময়ের দাবি এবং জনগণ তা মেনে নিয়েছিল খুব সহজে। চাহিদার প্রয়োজনে আমাদের সড়ে আসতে হয় বই-কিতাব হতে, শাসনতন্ত্রও এর বাইরে নয়। জনগণের জন্যে শাসনতন্ত্র, শাসনতন্ত্রের জন্যে জনগণ নয়, আমাদের আদালত হয়ত ভুলে গেছেন এ সহজ সত্যটা। প্রতিদিন যে হারে রিট হচ্ছে এবং আদালত যতটা দ্রুততার সাথে এর ফয়সালা দিচ্ছে যদি শুনি আদালত নির্ধারণ করে দিয়েছে এখন হতে আমাদের কিভাবে টয়লেট করতে হবে মোটেও অবাক হবনা। প্রাসঙ্গিক ভাবে প্রশ্ন জাগে, প্রধান বিচারপতির দরজায় যে ভদ্রলোক লাথি মারল তাকে কি আদালত অবমাননার দায়ে গ্রেফতার করা হবে না? নাকি বংগবন্ধু সৈনিকদের লাথি খেলে আদালত ধন্য হয়, পূণ্য হয়? বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১৮ মাসের শাসন নিয়ে আদালতে কেউ রিট করেছে বলে শোনা যায়নি। রহস্যটা কি? আদালতের দৃষ্টিতে ঐ সরকারও যদি অবৈধ হয় (যা হওয়াটা স্বাভাবিক) তাহলে কি হবে ঐ ’অবৈধ’ সরকারের গর্ভে জন্ম নেয়া শেখ হাসিনার বর্তমান ’স্মরণকালের সেরা’ গণতান্ত্রিক সরকার যার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে ’মহামান্য’ আদালত ?
ছবিটা দেখে খুব ভাল লাগল। ২১শে আগস্ট সভ্যতার বর্বরতম হামলার সাথে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউককে। আইনের হাত অনেক লম্বা এবং এ হতে কারও রেহাই নেই, এমনটাই আদালতের দাবি এ গ্রেফতার নিয়ে। কিন্তু সে ভাল লাগা নিমিষেই তিতে হয়ে গেল অন্য একটা ছবি দেখে। আওয়ামী লীগ নেতা ইকবালের সাঙ্গপাঙ্গরা পিস্তল উচিয়ে গুলি করছে প্রতিপক্ষের মিছিলে। ওরা ছিল ৪জন। যদিও বিএনপি তারপরও ছিল রক্ত-মাংসের মানুষ। এদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল আওয়ামী লীগের গুলি, যার নেত্রীত্বে ছিল আওয়ামী নেতা ইকবাল ও নুরন্ননবী শাওন। রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং ’মহান’ আদালতের সিদ্ধান্ত অব্যাহতি দেয়া হয়েছে খুনিদের। যদিও তা প্রকাশ করেনি তবে আদালতের সিদ্ধান্ত বিশ্লেষন করলে আমাদের মেনে নিতে হবে শেখ হাসিনাকে মারার চেষ্টা রাষ্ট্রীয় অপরাধ হলেও বিএনপিওয়ালদের মারা আইনের চোখে জায়েজ। তবে কি আমরা ধরে নেব বঙ্গবন্ধু সৈনিকদের হাতে মৃত্যু আমাদের ধন্য করে, পূণ্য করে? খুনি ইকবাল আর ডাবল খুনি শাওনের অব্যাহতি কি তাই প্রমান করেনা?
খবরটা মিডিয়াতে কেন যথাযোগ্য আদর পায়নি তার কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রীর তনয় জয় ওয়াজেদ সস্ত্রীক দোহা যাওয়ার পথে এয়ারপোর্টে সীল মারতে দেরী করেন এসআই হুমায়ুন খালেদ। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় প্রশাসনে এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এসআই খালেদকে। অভিযোগ, এসআই খালেদ জয় ওয়াজেদের ভিআইপি মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জনাব খালেদের কপালে সামনে কি আছে ’মহামান্য’ আদালত রায় দেয়ার আগেই আমরা আমজনতা তা বলে দিতে পারি। কারণ এটা বাংলাদেশ। এখানে বিচারক মানে নেত্রীদের গৃহপালিত সেবাদাস, আদালত মানে প্রতিপক্ষ আটকানোর রাজনৈতিক খোঁয়াড়।
- Tag this post:
- WatchDog's blog
- 989 reads
-
JUST VIEWED
Last viewed:
- একটি রাস্তার ইতিকথা
- মিথ্যা কি আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা?
- রাজনীতির ইফতার বনাম ইফতার রাজনীতি।
- ' ইয়েস্লি মোখাম্মেদ নে ইদয়ত্ ক গোরে, ত গোরা ইদয়ত্ ক মোখাম্মেদ্দু' - প্রসংগ মান্নান ভূইয়া
- বিশ্বকাপ ফুটবল হতে বাংলাদেশের আকাল বিদায়!
- অপরাধ ও শাস্তি, বাংলাদেশ পুলিশ ষ্টাইল
- হরতাল - ক্ষমতার final frontier!
- কল সেন্টার ব্যবসা, আতুর ঘরেই যার মৃত্যু!
- খেলা হয় দক্ষিন আফ্রিকায়, রক্ত ঝরে বরিশালের গৌরনদীতে...
- দুইয়ে দুইয়ে চার...
- অপরাধ ও পুরস্কার বাংলাদেশ স্টাইল!
- ফুটবল ফুটবল, দুরন্ত ফুটবল, চারদিকে ফুটবল জয়ধ্বনি
- ২০১১ সালেই ৪০ হাজার টেলিসেনটার
- পিপ শো, এবং জনৈক মাহমুদুর রহমান...
- ব্লগীয় দামামা...প্রসঙ্গ পাকিস্তান ও রাজাকার।
Latest Blogs
- মফিজের ১৩ হাজার ও একজন বিভাস চন্দ্রের মৃত্যু...টাকার বস্তা পাহাড় বাইয়্যা যায়!
- ম্যাথিউ, হেরাল্ড ও আমি, এবং আমাদের ঘরে ফেরা
- একজন দরবেশ বাবার কেচ্ছা
- স্বপ্নের কালো বিড়াল ও একজন প্রবাসীর দেশে ফেরা
- একজন মূখ্যমন্ত্রী ও একজন চোরের কাল্পনিক সাক্ষাৎকারঃ
- সুরঞ্জিত বাবুর বীচি ও আমার চাওয়া পাওয়া
- মোহন ও আরিফের জন্যে জিল্লুর প্রেসিডেন্ট আছেন। ভয় নেই 'আমাদের'।
- ক্রসফায়ারই যদি একমাত্র সমাধান তাহলে কেন তাদের নয়?
- আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন জনাবা প্রধানমন্ত্রী
- জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও হিন্দু দেবতাদের রক্ত পিয়াস...
Recent Comments
- ইলিয়াস আলীর দাফন হয়েছে পদ্মায়! -ফজলুল বারী
2 weeks 4 days ago - ড্রাইভার আজম কোথায় ...
2 weeks 4 days ago - সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে আইসিএক্স লাইসেন্স :
4 weeks 4 days ago - দিরাইয়ে আলিশান সেন মার্কেট উদ্বোধন : সমালোচনার ঝড়
4 weeks 4 days ago - শ্রীলংকার পত্রিকা এসব কি লিখছে!
4 weeks 6 days ago - বাণী চিরন্তনী | তারিখ: ০৯-০৪-২০১২
4 weeks 6 days ago - প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা বাংলাদেশের জন্য নয়
5 weeks 1 hour ago - খুলনায় আটককৃত র্যাব সদস্য
5 weeks 2 days ago - ইতিহাসই বিচার করবে এই মহিলার
5 weeks 5 days ago - আবাল প্রধানমন্ত্রী।
5 weeks 5 days ago





Comments
বদলে যায় বাপধন, বদলে যায়...
বিশ্বাস করতে চাই না সময় বদলালে রায়ও বদলে যায়
-------ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক
প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক বলেছেন, একই আদালতের একই বিচারপতি ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন রায় দেন। সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে রায়ও বদলে যায়। এই অভিযোগ আমি বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু অনেককেই এই অভিযোগ করতে শুনি। তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সুশাসন বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক এ কথা বলেন। সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের প্রশংসা করে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, তিনি (প্রধান বিচারপতি) অনেক অভিজ্ঞ, উচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি। আগামী সাত মাস প্রধান বিচারপতি থাকবেন। সাত মাসে হয়তো পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হবে। রফিক-উল-হকের অভিযোগ, ওয়ান ইলেভেনের সময় আপিল বিভাগ সবচেয়ে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, আদালত সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও নিরাপদ না হলে আইনের শাসন ও মানবাধিকার কোনোটিই প্রতিষ্ঠিত হবে না। তিনি বলেন, কোন কোর্ট কোন দলের পরিচয়ে হতে পারে না। আদালত হচ্ছে মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। মানুষ প্রত্যাশা করে সে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার পাবে। কিন্তু অমুক কোর্ট অমুক দলের এ ধরনের অভিযোগ শুনলে বড় কষ্ট লাগে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মিজর্া ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. মাহবুবউলস্নাহ, আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, নিউ এজের সম্পাদক নুরুল কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক বোরহান উদ্দিন, ব্র্যাকের শিক্ষক পিয়াস করিম প্রমুখ।
অনেক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেলেন এমপি শাওন
গায়েন্দা কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ : অনেক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেলেন এমপি শাওন
যুগান্তর রিপোর্ট
যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম আহমেদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করাই তার প্রধান ভুল ছিল বলে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন ভোলা-৩ আসনের এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেছেন, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনভাবেই তিনি জড়িত ছিলেন না। দলের অনেকের কাছে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক করণীয় নিয়ে পরামর্শ চেয়েও ভালো পরামর্শ পাননি। ফলে তাকে এখন নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বুধবার রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এসব কথা বলেছেন। ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডের পর এমপি শাওন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের যেসব নেতার পরামর্শ চেয়েছিলেন তাদের বেশ ক’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন গোয়েন্দারা। ডিবি’র এডিসি (দক্ষিণ) মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, এমপি শাওনের পিস্তলের গুলিতে ইব্রাহিম আহমেদ খুন হয়েছেন এটা ঠিক। তবে এমপি শাওনকে জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। সংশ্লিষ্টতা না
পাওয়ায় তাকে এ মামলায় আসামি করার সুযোগ নেই। অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ আইনেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। এজন্য তিনি আইনের দুর্বলতাকে দায়ী করেন। বুধবার রাতে দু’ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এমপি শাওনকে ডিসি ডিবি (দক্ষিণ) মাহবুবুর রহমানের অফিসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসময় সেখানে ডিবি’র জয়েন্ট কমিশনার মীর শহিদুল ইসলামসহ মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রাত ৯টায় এমপি শাওন সেখানে পৌঁছার পর তার সঙ্গে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। পরে এমপি শাওনের কাছে জানতে চাওয়া হয় ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি কি জানেন? কালা যেসব তথ্য দিয়েছে সেসব বিষয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ সম্পর্কেও তার কাছে জানতে চান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গোয়েন্দাদের অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন গোয়েন্দাদের।
ওই জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা তার ঠিক হয়নি। এখন সে চেষ্টাই তার জন্য কাল হয়েছে। সেজন্য এমপি শাওন গোয়েন্দাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার পর তিনি কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এখন তার কাছে মনে হচ্ছে, দলের যেসব নেতার পরামর্শে তিনি এ কাজ করেছেন সেটা ভুল ছিল। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও জানান, ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট নানা প্রশ্ন নিয়েই শাওনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এমপি শাওন জানিয়েছেন, ঘটনার দিন ইফতারের কিছু সময় আগে তিনি দেহরক্ষী দেলোয়ারের কাছে ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পান। খবর পেয়ে তিনি নিচে নেমে দেখেন গাড়িচালক কালা নেই। গুলিবিদ্ধ ইব্রাহিম কোথায় সেটাও তিনি জানতে চেয়েছেন উপস্থিত দলীয় কর্মীদের কাছে। ইব্রাহিমকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে শুনে শাওন নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। এসময় তিনি মোবাইল ফোনে কালার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু পাচ্ছিলেন না। গাড়ি চালিয়ে বাংলামোটর পর্যন্ত যাওয়ার পর কালার মোবাইল ফোনে তার দেহরক্ষী দেলোয়ার যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তখন মোবাইল ফোনে শাওন কালার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এমপি শাওন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তখনও তার গাড়ি চালক কালা তাকে বিভ্রান্ত করেছে। ইব্রাহিম ঘটনাস্থলেই মারা গেছে, তাকে জানায়নি সে। কালা তখন জানিয়েছিল, ইব্রাহিম পিস্তল নাড়াচাড়া করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। কালার মুখে এ ধরনের কথা শুনে শাওন তাকে অভয় দিয়ে বলেন, তাহলে তোর ভয় কিসের। তুই তো কোন অপরাধ করিসনি। তখন তিনি কালাকে বলেন, তুই বাসা থেকে বেরিয়ে আয়। পরে তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাড্ডায় যান। সেখান থেকে তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাড্ডা থেকে কালাকে নিয়ে আসেন। পরে কাকরাইল এসে তারা আবার গাড়ি বদল করেন। যুবলীগের জনৈক শহিদুল্লাহ চৌধুরীর গাড়িতে করে এমপি শাওন যান আরেক যুবলীগ নেতা মাহীর অফিসে। এসময় তার সঙ্গে যুবলীগ নেতা সম্রাটসহ যুবলীগের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী ছিলেন। সেখান থেকে যান বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ অফিসে। সেখানে আরও কিছু নেতার সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরে সেখান থেকে যুবলীগের ১০-১৫ জন নেতাকর্মীকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন ইব্রাহিম মারা গেছেন। লাশ রেখে চলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, সেসময় তিনি কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। এক আওয়ামী লীগ নেতার পরামর্শে পরে তিনি সেখান থেকে কালাকে শেরেবাংলা নগর থানায় পাঠান। সেখানে কালার বক্তব্য অনুযায়ী থানা পুলিশই এজাহারটি কম্পোজ করে দিয়েছিল। এমপি শাওনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে তার মনে হয়েছে, এমপি শাওনের অনেক জবাবই সাজানো। আবার অনেক কথাই তিনি গোপন করেছেন। খুব শিগগির এ মামলার চার্জশিট দেয়া হবে জানিয়ে গোয়েন্দারা জানান, এর আগে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নিহত যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম আহমেদের স্ত্রী রিনা ইসলাম বলেছেন, পুলিশ ও গোয়েন্দারা এমপি শাওনকে বাঁচানোর যত চেষ্টাই করুক, সত্য একদিন বেরিয়ে আসবেই। এমপি শাওনের অনেক ষড়যন্ত্র ও চেষ্টা-তদবিরের পরও ইব্রাহিমকে যে হত্যা করা হয়েছে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে স্বামীর খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে তিনি বলেন, কালা গুলি করলেও ইব্রাহিমকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হচ্ছেন এমপি শাওন। গত ১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় এমপি শাওনের লাইসেন্সকৃত পিস্তলের গুলিতে নিহত হন যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম। ওইদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে এমপি শাওনের গাড়িচালক আবুল কালাম ওরফে কালা বাদী হয়ে ইব্রাহিমের স্বজনদের না জানিয়েই শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেন। প্রথমে থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত শুরু করলেও ১৭ আগস্ট এর তদন্ত কার্যক্রম ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৮ আগস্ট ইব্রাহিমের ছোট ভাই মাসুম আহমেদ বাদী হয়ে এমপি শাওনসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২৯ আগস্ট ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৫৪ ধারায় এমপি শাওনের গাড়ি চালক কামাল হোসেন কালা ও পিএস সোহেল আহমেদকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করে। পরদিন তাদের আদালতের নির্দেশে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এ জিজ্ঞাসাবাদের শেষদিন গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর মশিউর রহমান বাদী হয়ে ‘অজ্ঞাত ব্যক্তি’দের আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে ওই মামলায় কালা ও সোহেলকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। কালা আদালতের কাছে ইব্রাহিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছে।
শাওনের পক্ষে পুলিশ কমিশনারের সাফাই
‘ইব্রাহিমের মৃত্যুর সঙ্গে শাওনের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই : অস্ত্র আইনে কেন আলামত নষ্টের অভিযোগেও
মামলার সুযোগ নেই : রিনার অভিযোগ ভিত্তিহীন’
যুগান্তর রিপোর্ট
যুবলীগ নেতা ইব্রাহিমকে হত্যার জন্য তার পরিবারের পক্ষ থেকে এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনকে দায়ী করা হলেও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার একেএম শহীদুল হক আবারও বললেন, এমপি শাওন কোনভাবেই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাই তাকে গ্রেফতার করাটাও অন্যায়। পুলিশ কমিশনার বলেন, নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে হয়রানি না করার জন্য তিনি ডিএমপির সব সদস্যকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, শাওন কেন, কোন এমপি বা মন্ত্রী খুন করে পার পেয়ে যাবে তা হতে পারে না। বিশেষ করে তিনি এ ধরনের চাকরি করতে অভ্যস্ত নন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শহীদুল হক বলেন, ‘আল্লাহকে হাজির নাজির রেখে বলতে পারি শাওনকে রক্ষা করার মতো কোন ইচ্ছা পুলিশের নেই।’ বৃহস্পতিবার ডিএমপি সদর দফতর মিলনায়তনে পুলিশের মাসিক অপরাধ সভার পর সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, সংসদ সদস্য শাওনের অতীত খারাপ থাকতে পারে। তবে ইব্রাহিমের মৃত্যুর সঙ্গে তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। ইব্রাহিমকে তিনিই খুন করেছেন পুলিশি তদন্তে এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যে কারণে তাকে গ্রেফতার করার প্রশ্নই ওঠে না।
ইব্রাহিম হত্যার তদন্তে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় জজ মিয়ার কাহিনীর মতো এবার কালা মিয়ার কাহিনী রচিত হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক। তিনি বলেন, শাওনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে কেন, আলামত নষ্টের অভিযোগেও মামলা দায়ের করার সুযোগ নেই। তিনি কোন অপরাধ করেননি। যে গাড়ির ভেতরে অস্ত্র পাওয়া গেছে সেটি তার নিজেরই গাড়ি। ডিএমপি কমিশনার বলেন, পুলিশের ওপর আস্থা নেই ইব্রাহিমের স্ত্রী রিনার। কেবল রিনা ইসলামই বলেছেন এমপি শাওন তার স্বামীকে হত্যা করেছে, অন্য কেউ বলেননি। যিনি একথাটা বলেছেন, তিনি ঘটনার দিন রাজবাড়ীতে ছিলেন। পুলিশ কমিশনার বলেন, রিনা ইসলামের অভিযোগ ভিত্তিহীন। ঘটনার পর নিহত ইব্রাহিমের ভাইকে মামলা করতে বলা হয়েছিল কিন্তু তিনি রাজি হননি। শহীদুল হক আরও বলেন, এরকম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে নানারকম কথা আসে। কিন্তু সেটা যে সত্যি তা ভাবার কোন অবকাশ নেই। শাওনের পরামর্শে তার গাড়িচালকের অপমৃত্যু মামলা দায়ের থেকে শুরু করে তদন্তের শেষ পর্যন্ত পুলিশ শাওনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, জনমনে পুলিশের ওপর অনাস্থা তৈরি হয়েছে বলে পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, মিডিয়া মনের মাধুরী মিশিয়ে রিপোর্ট করলে করার কিছু নেই। তিনিও সাংবাদিকদের কাছে পাল্টা কিছু প্রশ্ন করেন। একজনের বৈধ অস্ত্র দিয়ে অন্য ব্যক্তি অবৈধ ঘটনা ঘটানোর দায়ে পুলিশ ওই লাইসেন্সধারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে, এ ধরনের একাধিক ঘটনার উদাহরণ রয়েছে। তাহলে শাওনের লাইসেন্সকৃত পিস্তল, গাড়ি ব্যবহার হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, উদাহরণের ওইসব ব্যক্তিকে কি কারণে গ্রেফতার করা হয়েছিল তা বলতে পারব না। তবে এ বিষয়ে শাওন নির্দোষ। তিনি বলেন, সন্দেহ করে তো কাউকে গ্রেফতার করা ঠিক নয়। প্রথম থেকেই শাওনকে বাঁচানোর জন্য পুলিশ চেষ্টা করছে এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কমিশনার বলেন, এটা সঠিক নয়। ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য শাওনের গাড়িতে তার নিবন্ধিত পিস্তলের গুলিতে ১৩ আগস্ট ইব্রাহিমের মৃত্যু হয়। রাজধানীর আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আগস্টে উদ্ধার, গ্রেফতার এবং মামলার সংখ্যা তুলনামূলক কম হয়েছে। ঈদেও নিরাপত্তা নিয়েই পুলিশকে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। আগস্টে ডিএমপির ৪১ থানায় ৩টি ডাকাতি, ২১টি দস্যুতা, ১৭টি খুনসহ ১ হাজার ৯৩০টি মামলা হয়।
Post new comment